গল্প
গল্প নয় : একটি চিঠি - হারুন ইবনে শাহাদাত

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশঃ ৮ মার্চ ২০২৫, ১০:৩৫ এএম

‘মা আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। স্যরি আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য করে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। একদিন তো মরতেই হবেই। তাই মৃত্যুর ভয় করে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুও অধিক শ্রেয়। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়, সে-ই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেঁচে না ফিরি তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই।’ - আনাস
মায়ের কাছে লেখা এ চিঠির লেখক বৈষম্যহীন দুর্নীতি-চাঁদাবাজ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের দিয়ে আনাস ঘুরে বেড়াচ্ছে জান্নাতে সবুজ পাখিদের সাথে। তার প্রিয় ছিল ফুল, পাখি সবুজ, ঘাস, গাছ-গাছালি। তার ছোট হৃদয় জুড়ে ছিল বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা। সুবোধ, শান্ত ও মা-বাবার বাধ্য কিশোর আনাস। মা-বাবা আর ছোট দুই ভাইয়ের অটুট বন্ধন টুটে রাজপথে ছুটে গিয়েছিল রাজপথে। তার রক্তাক্ত শহীদি মুখে অম্লান হাসি দেখার আগে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি তার বুকে লুকিয়ে ছিল এমন সাহসী অগ্নিগিরি। তার সেই হাসি মুখের অব্যক্ত কথাগুলোই আজ গল্প-কবিতা আর আমাদের নতুন স্বাধীনতার মহাকাব্য। শহীদ আনাস আজ প্রেরণার বাতি জ্বালাচ্ছে এদেশের প্রতিটি কিশোরের হৃদয়ে।
২.
আনাস কোনো কল্পিত বা ফিকশনের নায়কের নয়। ৩৬ জুলাই গণ আন্দোলনের এক সাহসী বীর কিশোর। এ তাঁর সাহসী জীবনের কাহিনীর সাথে কিছু কল্পনা, কোনো গল্প নয়। হ্যাঁ ৩৬ জুলাই বিশ্বের কোনো দেশের ক্যালেন্ডারে এ তারিখটি নেই। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার রক্তে লেখা, একান্ত নিজেদের একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ। তাঁদের বুকের তাজা রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ৫ আগস্ট বিজয়ের সূর্যোদয় নতুন স্বাধীনতার দিন হিসেবে স্মরণীয় ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই। এ শতাব্দীর কুখ্যাত এক নারী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অকুতোভয় সাহসে বুকভরা রাজপথে নেমেছিল বাংলাদেশের কিশোর-তরুণ ছাত্ররা। তাদের নেতৃত্বে তাদের সাথে মিশে গিয়েছিল সারা দেশ। ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বুলেট-বোমা উপেক্ষা করে গোটা দেশের বিপ্লবীদের লক্ষ্য ছিল গণভবন। কারণ সেখান থেকেই স্বৈরাচারী সরকার চালিয়েছে আগ্রাসী দুঃশাসন। সেই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার লাখো কিশোর বীরদেরই একজন ছিল, এ পত্র লেখক আনাস। ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেয় মনে করা সত্য উপলব্ধি কিশোর আনাসকে করেছে সময়ের সেরা বিপ্লবী।
তাঁর শাহাদাতের একদিন আগেও কেউ ভাবতে পারেনি তার বুকে এত সাহস আর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন জ¦লছে। রাজপথে নামার আগের রাতে বাবা-মা’র সাথে বসে টেলিভিশনে খবর দেখছিল আনাস।
স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত রাজপথ, ‘চাইলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার! কে বলছে কে বলছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার!’ ‘আমি যদি রাজাকার দেশ কি তোমার বাবার?’ ‘সকাল বিকাল মানুষ মেরে যারা নাস্তা চাও দেশ ছেড়ে চলে যাও’ কিংবা, ‘লাখো শহীদের দামে কেনা/ দেশটা কারও বাপের না’। ‘আমার খায়, আমার পরে,/ আমার বুকেই গুলি করে’। ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়/ বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘তোর কোটা তুই নে,/ আমার ভাই ফিরিয়ে দে’ কিংবা ‘লাশের ভেতর জীবন দে/ নইলে গদি ছেড়ে দে’, ‘এক দুই তিন চার,/ শেখ হাসিনা, গদি ছাড়’, ‘দফা এক দাবি এক,/ খুনি হাসিনার পদত্যাগ’ কিংবা ‘এক দফা, এক দাবি/ স্বৈরাচার তুই কবে যাবি’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ‘যদি তুমি ভয় পাও/ তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও/ তবে তুমিই বাংলাদেশ’।’
‘বাবা আমি তো আর পারছি না, আমি মিছিলে যাবো,’ বাবার দিকে তাকিয়ে বলে ছোট আনাস। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বাবার বুকটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে।
আনাসের দিকে তাকিয়ে বলেন তিনি, ‘বাবা তুমি তো অনেক ছোট, মাত্র হাই স্কুলে পড়ো, বড়ো হও..।’ কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে যান। নিজেকে বড়ো স্বার্থপর মনে হয় তার। প্রতিদিন শত শত তরুণ ছাত্র-জনতা জীবন দিচ্ছে, সারা দেশ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। তার বুকের মানিককে তিনি কীভাবে আগলে রাখবেন?
টেলিভিশনে গান বাজছে, মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল।/ মোরা বিধাতার মতো নির্ভয়, মোরা প্রকৃতির মত সচ্ছল। / আকাশের মতো বাধাহীন,/ মোরা মরু সঞ্চার বেদুঈন,/ (মোরা) বন্ধনহীন জন্ম- স্বাধীন, চিত্ত মুক্ত শতদল।
চল চল চল..।
টেলিভিশন তখনো চলছে। কিন্তু আনাস আর বসে থাকতে পারছে না। সে তার ছোট রুমটায় চলে যায়। তার বুকের মাঝে দারুণ ঝড় বইছে। সে ঝড় অশ্র” হয়ে দুই চোখে প্লাবন হয়ে ঝরে পড়ছে। বালিশে মুখে চেপে কান্নার শব্দ লুকানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাহমিদের হাসি হাসি মুখ, সৈকতের রক্ত ভেজা সাহসী বুক। আবু সাঈদের সংগ্রামী মুখ। তার কানে মধুর সঙ্গীতের মতো বাজছে মুগ্ধের নিষ্পাপ কণ্ঠস্বর পানি পানি লাগবে...
৩.
ফজরের আজানের মধুর আহ্বানে ঘুম ভাঙে আনাসের। আল্লাহু আকবার, আল্লাহ মহান। আল্লাহ মহান... তাহলে আর কাকে ভয়। না আর কোনো ভয় নেই। অন্যায় অসত্য আর জালিমের প্রতিবাদ করা ঈমানের দাবি।
আপন মনে গেয়ে ওঠে আনাস, ‘ঈমানের দাবি যদি কুরবানি হয়...’
আনাস মনে মনে পণ করে, ‘আমি আজ সেই দাবি পূরণ করবই।’ সে সিমকার্ড ছাড়া মোবাইল ফোনটা পকেটে নেয়। সিমকার্ড না থাকলেও বাবা-মা’র নম্বর ফোনে সেফ করা আছে। যদি তার কথা বলার মতো অবস্থা না থাকে এখান থেকে নম্বর নিয়ে বাসায় কেউ হয়তো ফোন করতেও পারে, সে আর ভাবতে পারে না। বাসার একটা চাবি তার পকেটে ছিল।
‘চাবি’। তার মুখে মুচকি হাসি। তার মনে পড়ে মা বারবার বলেছেন, এই চাবি হারোনো যাবে না। তাই চাবিটা যে যত্ন করে টেবিলে রাখে।
‘আমি তো আজ বাড়ি ফেরার জন্য বের হচ্ছি না। বিজয় নিশান উড়িয়ে তবেই ফিরবো। মরলে শহীদ, বাঁচলে গাজী।’ এমন সব ভাবনা শেষে আনাস চিঠিটা লিখে। তারপর বাসা থেকে বের হয়। মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে আর দেরি নয়, নেমে পড়ে তার চিরচেনা পুরান ঢাকার চানখাঁর পুলের রাস্তায়।
৪.
রাজধানী ঢাকার চানখাঁরপুল হাজার হাজার মানুষের স্রােত। ঠেকাবে সাধ্য কার। সবার হাত মুষ্টিবদ্ধ। সবার কণ্ঠে আকাশ বাতাস কাঁপানে স্লোগান। বুকভরা সাহস। আদর্শ একাডেমি গেন্ডারিয়ার দশম শ্রেণিতে পড়া তার বন্ধুরাও আছে, আছে অন্য ক্লাসের বড়ো ভাই, ছোট ভাইরাও। হাজার মানুষের এ স্রােতে তার পরিচিত মুখগুলোকে মনে হয় এক একটা ধ্রুবতারা। স্বৈরাচারী সরকারের গোলাম অন্ধ অতি উৎসাহী কিছু পুলিশের সাথে অস্ত্র হাতে আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়ছে নিরস্ত্র জনতার মিছিলে। গুলিতে খসে পড়ছে এক একটা ধ্রুবতারা। তারপরও থামছে না মিছিল। শহীদের রক্ত মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে চলছে সাহসী ছাত্র-জনতার মিছিল, লক্ষ্য গণভবন স্বৈরাচারের আস্তানা, হাসিনার পদত্যাগ।
রিকশায়, ভ্যানে এবং কোলে করে আহত ও শহীদের দেহ নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে সাথীরা। রিকশা, ভ্যান ও সিএনজি চালকরা বিনা ভাড়ায় নিয়ে যাচ্ছে।
রক্তমাখা শহীদের দিকে তাকিয়ে আনাসের মুখ মনে পড়ে, ‘আল্লাহর রাসূল (সা)-এর আহ্বানে উহুদের ময়দানে ছুটে যাওয়া আনাস ইবন নাদার (রা)-এর কথা। তার দাদীর কাছে সে এ কাহিনী শুনেছিল, মুখে কথা ফোটার আগেই। দাদী মুখ হাসি-খুশি হয়ে বলতেন তোমার নাম আনাস, জানো এই নাম একজন বীর শহীদ সাহাবির। সেই সাহাবির নামেই তোমার দাদা আদর করে তোমার এ নাম রেখেছিলেন। দাদাকে কে খুব ভালোবাসতো। আনাস তার দাদীকে হয় আরো বেশি ভালোবাসতো। আনাস তাকে দাদী নয়, আম্মু বলে ডাকতো। দাদীআম্মু আজ নেই ঘুমিয়ে আছেন জুরাইনের গোরস্থানে।
আনাস ইবন নাদার (রা) উহুদের ময়দানে অসীম সাহসিকতার সথে যুদ্ধ করে শহাদাত বরণ করেন। দাদীর কথা আর রাসূলের সাহাবি আনাসের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে তার মনেও জাগে শাহাদাতের তামান্না।
আনাস বজ্রকণ্ঠে স্লোগান তোলে, ‘মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী আমি আজ মরতে রাজি।’
স্বৈরাচারের ঘাতক বুলেট শাঁ শাঁ করে এসে লাগে আনাসের বুকের বাম পাশে। আনাস রাজপথে লুটিয়ে পড়ে। তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়; ‘লা-ইলাহা ইলল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ...’
লেখক: হারুন ইবনে শাহাদাত
কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।
© কফিপোস্ট ডট কম
অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন