KOFIPOST

KOFIPOST

ইসলামের ইতিহাস ১ম

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মদিনায় হিজরতের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর

মোঃ মাসুদ রানা
অ+
অ-
হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মদিনায় হিজরতের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর
ছবি: প্রতীকী ছবি

ভূমিকা : বিশ্ব মুসলিম ইতিহাসে হিজরত একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। যুগে যুগে যারাই ইসলামের আদর্শ প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছেন তাদের কেউই নিজ জন্মভূমিতে সমাদৃত হননি। নিজ জন্মভূমিতে তারা হয়েছেন লাঞ্ছিত, উপেক্ষিত আর নির্যাতিত। মানবতার মহান শিক্ষক মহানবি (সা.)-এর জীবনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কুরাইশদের অত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরত করে মহানবি (সা.). ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটান। এই হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা ঘটায় ।



হিজরতের কারণসমূহ : হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের পেছনে অনেকগুলো কারণ নিহিত ছিল। নিম্নে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের চারটি কারণ আলোচনা করা হলোঃ


১. প্রাকৃতিক প্রভাব : অনুর্বর ও পর্বতময় মক্কার অধিবাসীরা শুষ্ক জলবায়ু ও উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য বদমেজাজী, জড়বাদী ও রুক্ষ স্বভাবের ছিল। অপরদিকে মদিনার সুশীতল স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া ও শস্য-শ্যামলা ভূমি অধিবাসীদেরকে মার্জিত, দয়ালু, পরোপকারী ও নম্রস্বভাবী রূপে গড়ে তোলে। ফলে মদিনায় আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করা মহানবির (সা.) পক্ষে খুব সহজ হয়।


২. মনস্তাত্ত্বিক কারণ : বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, মহাপুরুষগণ তার নিজ দেশেই সবচেয়ে বেশি বিরোধিতার সম্মুখীন হন। মহানবির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তাই মক্কায় যখন তার প্রতি নির্যাতন ও বিরোধিতা চরম আকার ধারণ করে, তখন তিনি মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের একটি প্রধান কারণ ছিল মনস্তাত্ত্বিক কারণ ।


৩. কৌলীন্য ও আভিজাত্য : আভিজাত্য ও কৌলীন্য প্রথা রক্ষণশীল বিধর্মী কুরাইশদের মধ্যে এরূপ মজ্জাগত ছিল যে, ইসলামের সাম্য ও শান্তির বাণীতে এই প্রথা ছিন্নভিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়। ফলে অভিজাত শ্রেণি মহানবিকে সহ্য করতে পারেনি। সৈয়দ আমীর আলী যথার্থই বলেন, “পূর্বতন বৈষম্য দূরীভূত করিয়া সকলকে সমান অধিকার প্রদান তাদের রীতিনীতি বিরুদ্ধ ছিল”


. কুরাইশদের নির্যাতন : হিজরতের একটি অন্যতম কারণ ছিল কুরাইশদের নির্যাতন। মক্কায় প্রকাশ্য ইসলাম প্রচার করায় এবং ইসলামের প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে নিজেদের স্বার্থহানীর আশংকায় কুরাইশরা মহানবির উপর চরম নির্যাতন চালায়। ফলে তিনি হিজরত করতে বাধ্য হন ।


৮. আত্মীয়তার সম্পর্ক : পিতা আব্দুল্লাহ ও প্রপিতামহ হাসিম মদিনায় বিবাহ করেছিলেন। এই সম্পর্কের কারণেই মদিনাবাসী মহানবির প্রতি ছিল সহৃদয় ও আন্তরিক। এছাড়া মাতৃকূলের দিক দিয়ে মদিনার সাথে মহানবির আত্মিক সম্পর্ক তার মদিনায় হিজরতের অন্যতম কারণ।


৬. মুসাবের অনুকূল রিপোর্ট : মদিনাবাসীর আমন্ত্রণে মহানবি (সা.) হিজরতের পূর্বে তার সহচর মুসাবকে মদিনার পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। মুসাব মদিনার ব্যাপারে অনুকূল রিপোর্ট দিলে মহানবি হিজরত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।


হিজরতের ফলাফল: হিজরতের ফলে ইসলামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ভিত্তি দৃঢ় হয়। এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করে এবং পরবর্তীতে ইসলামের বিস্তার ও বিজয়ের পথ সুগম করে। নিচে মদিনায় হিজরতের পর চারটি ফলাফল আলোচনা করা হলোঃ


১. ইসলামের প্রতিষ্ঠা: মদিনায় হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে মুসলিমরা নিজেরা একটি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলে।


২. মদিনার স্নিগ্ধ পরিবেশ: মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি আস্থা বাড়ে এবং মুসলিমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ধর্মীয় জীবনের পদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করেন।


৩. ইসলামের বিস্তার: মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে ইসলামের নতুন কর্মসূচি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে মুসলিমদের নানা অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার সহায়ক হয়।


৪. মদিনার সংবিধান (মিসাক আল-মদিনা): মদিনায় হযরত মুহাম্মদ (সা.) একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেন যা মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করেছিল। এটি ইসলামের প্রাথমিক রাষ্ট্র পরিচালনার নীতির রূপরেখা প্রদান করে।


উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, হিজরতের পর থেকে ইসলামের প্রচার ও প্রসার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ইসলামের ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা করে। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, হিজরত হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের সফলতার চাবিকাঠি এবং আদর্শ বাস্তবায়নের সহায়ক।

ট্যাগস:

ডিগ্রিপড়াশোনামদিনায় হিজরতইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি

কফিপোস্টের সর্বশেষ খবর পেতে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেল অনুসরণ করুন।

© কফিপোস্ট ডট কম

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন